গণমাধ্যমের মূল কাজ হচ্ছে জনগণকে সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রদান করা। একজন নাগরিক রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার অধিকার রাখেন। সেই তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেয় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম। যদি গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে তথ্য বিকৃত হয়, সত্য গোপন থাকে এবং জনগণ বিভ্রান্তির শিকার হয়। এতে সমাজে গুজব, অপপ্রচার ও অস্থিরতা বাড়ে। স্বাধীন গণমাধ্যম তাই একটি সচেতন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম হাতিয়ার।
সাংবাদিকরা সমাজের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র সামনে আনেন। তারা অনেক সময় ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, দুর্নীতিবাজ চক্র কিংবা অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও চাপের মুখে পড়েন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়, শারীরিকভাবে হামলা করা হয়, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি অনেক সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে সত্য প্রকাশের কারণে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকরা অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা দুর্নীতিবাজ চক্রের রোষানলে পড়েন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে শারীরিক হামলা, হুমকি কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আবার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও সাইবার হামলাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে তথ্যপ্রবাহ অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া তথ্য, গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। সত্য যাচাই করে নির্ভুল সংবাদ প্রকাশ করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ভয়ভীতি বা চাপের মধ্যে থেকে কখনোই নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে যা খুশি তাই প্রচার করার অধিকারকে বোঝায় না। এর অর্থ হলো দায়িত্বশীল, সত্যনিষ্ঠ ও নৈতিক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিককে অবশ্যই তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করতে হবে এবং সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায় এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে রাষ্ট্রকেও সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করতে হবে এবং তথ্যপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। কারণ গণমাধ্যম বিভিন্ন সমস্যার চিত্র তুলে ধরে সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করে। এতে দ্রুত সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় সংবাদ প্রকাশের পর দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিংবা জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তাই গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা হলে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হয়। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। অন্যদিকে যেসব দেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত বা সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, সেসব দেশে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। প্রতি বছর ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করা হয়। এই দিবসে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। এটি প্রমাণ করে যে, বিষয়টি কেবল কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক বাস্তবতা।
বর্তমান সময়ে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক নারী সাংবাদিককে সামাজিক বাধা, অনলাইন হয়রানি ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় তাদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয় বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অনলাইন সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রসারের ফলে সংবাদ পরিবেশনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এখন মুহূর্তেই একটি সংবাদ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে সাইবার অপরাধ, হ্যাকিং, ডিজিটাল নজরদারি এবং তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি। ফলে সাংবাদিকদের শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে বুঝতে হবে যে, স্বাধীন গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়। বরং এটি রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী করতে সহায়তা করে। সাংবাদিকদের ভয়ভীতি, চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হলে তা পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সংবাদ প্রকাশে অতিরঞ্জন, বিভ্রান্তি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচার গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি পেশাগত মান ও নৈতিকতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সাংবাদিক পর্যাপ্ত বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা স্বাস্থ্যসুবিধা পান না। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তারা নানা ঝুঁকি নিলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। তাই সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ সাংবাদিকদের আরও সাহসী ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
শিক্ষিত, সচেতন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। যখন মানুষের সমস্যা, দুর্ভোগ কিংবা ন্যায্য দাবি গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন রাষ্ট্র ও সমাজ তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। তাই গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা মানে জনগণের অধিকারকে শক্তিশালী করা।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যই শক্তি। আর সেই তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে সাংবাদিকতা। যদি সত্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়, তাহলে সমাজ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। দুর্নীতি, অন্যায় ও বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা বা হুমকির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন, পেশাগত সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে কখনো উন্নয়ন বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকলে সমাজ নিরাপদ থাকবে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হবে। তাই সময়ের দাবি হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ একটি স্বাধীন গণমাধ্যমই পারে সত্যকে তুলে ধরতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনে নেতৃত্ব দিতে।
[লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)Email:lionganibabul@gmail.com




