নিজস্ব প্রতিবেদক-♦♦
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিষয়ক অতিরিক্ত পরিচালক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রতারণা নানা কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছে। ব্যাংকে কর্মরত থেকে পদবীকে পুঁজি করে সাধারন মানুষকে ব্যাপক হয়রানি করার অভিযোগ গড়ে উঠেছে। এযেন তাঁর কর্মের পিছনে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে সাধারন মানুষের জমিজমা টার্গেট করে, নিরহ মানুষকে আইনের ভয়ভিতি বা আইনের ফাঁদে ফেলে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। কোন প্রকার সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই সাধারন মানুষকে নিজে বাদী হয়ে মামলা করার অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন কর্মকাণ্ডে আদালতে আসামিদ্বয়ের উপস্থিতিতে বিচারকের এক তোপের মূখে পড়েছিলেন হাবিব। সে সময় নানা তালবাহানা মিথ্যা বানোয়াট নাটক সাজিয়ে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পার পেয়েছেন এই অভিযুক্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা হাবিব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়ার্ক পারমিট ভিসার মাধ্যমে জাপানে পাঠানোর কথা বলে ব্যাংকার হাবিবের তাঁর নিজ এলাকা সুনামগঞ্জ থেকে নিরহ ২৬ জনের কাছ থেকে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা নিয়ে এলাকা ছাড়েন।এটা ছিলো তাঁর প্রতারণার এক প্রধান কৌশল।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর এলাকায় ব্যাংকার হাবিব জমিজমা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে পরিচয় মিলে প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধা জাপান রাজু নামের এক ব্যক্তির সাথে। তাঁর সাথে কৌশল অবলম্বন করে সখ্যতা গড়ে তুলে হাবিবুর রহমান ইতিপূর্বেও বিদেশে পাঠানোর নাম করে অনেকের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যাক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ ও ভুক্তভোগী ২৬টি পরিবার নি:শ্ব হয়ে গেছেন। এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রবাসী জাপান রাজুর নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন জড়িয়ে পড়েন তিনি। এ সকল আয়ের উৎসব দিয়ে হাবিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জ সহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে গেছেন।
আরও জানা গেছে, হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্তিশালী আইন বিষয়ক অতিরিক্ত পরিচালক দাবী করে, দেশের প্রত্যন্তঅঞ্চলে ঘুরে ঘুরে ভিজিটিং কার্ড বিতরণ করে, ব্যক্তি মালিকানা ব্যাংক লোন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রতিষ্ঠানের মোটা অংকের অর্থ মৌকুফের কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
এছাড়াও এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কাঁচপুর এলাকার নিরহ প্রবাসী জাপান রাজুকে জিম্মি করে, মদনপুর ললাটি এলাকায় তাঁর ক্রয়কৃত সম্পত্তি অবৈধ ভাবে ভয়ভিতি দেখিয়ে দখলের চেষ্টা ! এবং তাঁর ৪টি বাড়ির উপর নেয়া সোনারগাঁ শাখার আইএফআইসি ব্যাংকে মর্টগেজ লোন ৩ কোটি টাকা, যার লভ্যাংশ পরিমাণ আসে প্রায় ২৫ লাখের মতো। এমন লভ্যাংশ মৌকুফের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে ৮ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য হাতিয়ে নিয়েছেন হাবিব। এমন কর্মকাণ্ডে প্রবাসী রাজু তাঁর প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হলে, তাঁর দেয়া টাকা ফেরত চাইলে দু’জনের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
এমতাবস্থায় অভিযুক্ত মো: হাবিবুর রহমান (৫৬) পিতা আজিদ উল্ল্যাহ, স্থায়ী ঠিকানা সাং টংগর, ডাকঘর তারাপাশা-৩০৫০ দিরাই, সুনামগঞ্জ, এবং বর্তমান ঠিকানা ২১/১-এ, হাটখোলা রোড, ওয়ারী, ঢাকা মর্মে নিজে স্বয়ং বাদী হয়ে, অপকৌশল অবলম্বন করে রাজধানীর বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত (আমলী-বিমানবন্দর থানা), সিআর মামলা নং ১০৩/২০২৫, ধারা- ৪০৬/৪২০/৩৪/১০৯ দন্ডবিধি ১৮৬০’র একটি মিথ্যা-বানোয়াট-ভিত্তিহীন মাললায় প্রবাস রাজু সহ ৫ জনকে হয়রানি করেন প্রতারক হাবিব।
এ মামলায় ভূক্তভোগীরা হলো- ১। রাজু আহাম্মদ (৩৯) পিতা মো: জামান, সাং সোনাপুর, সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ।
২। লুবনা খানম (২৮) স্বামী রাজু আহাম্মদ, পিতা সোহরান মোল্লা।
৩। মো: বজলুর রহমান (৪৬) পিতা আলাউদ্দিন, সাং মিজমিজি পূর্বপাড়া, থানা সিদ্ধিরগঞ্জ, জেলা নারায়ণগঞ্জ।
৪। মো: মনোয়ার হোসেন বিটন (৪৫) পিতা মো: সিরাজুল ইসলাম, সাং ৮২৪ দনিয়া, কদমতলী, ঢাকা।
৫। মো: রুহুল (৪০) পিতা মৃত লতিফ ওরফে লতু, সাং কাঁচপুর উত্তরপাড়া, থানা সোনারগাঁ, জেলা নারায়ণগঞ্জ’কে আসামি করে ব্যাপক হয়রানি করেন তিনি। বর্তমানে প্রবাস রাজুর পরিবার সকলে এ মামলায় জামিনে আছেন।
এবিষয়ে রেমিট্যান্সযোদ্ধা প্রবাসী রাজু ডেইলি সকালের কাগজ’কে লিখিত ভাবে একটি অভিযোগে জানান, কুতুবপুর এবং মৌচাকে হাবিবুর রহমানের কয়েকটি বাড়ী রয়েছে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের নামে, সেখানে বসবাসরত অবস্থায় আমার সাথে এলাকার নুর হোসেন নামে এক ব্যাক্তির সাথে পরিচয় হয়। তাঁর সাথে দিন দিন ঘনিষ্টতার সূত্রধরে, আমার কাঁচপুরে বাড়ির উপরে ৩ কোটি টাকা মর্টগেজ লোনের লভ্যাংশের ২৫ লাখ টাকা মৌকুফের কথা বলে প্রতারক হাবিবুর রহমান আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি কাজও করে দেন না এবং টাকা ফেরত চাইতে গেলে নানা তালবাহানা কথাবার্তা বলেন।
তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের প্রতি আইনানুগ ব্যবস্থার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি আরও জানান, হাবিবুর রহমান নিজেকে নুর হোসেনের বন্ধু বলে পরিচয় দেয়। সে আমার নাম ব্যবহার করে ওয়ার্ক পারমিটে জাপানে লোক পাঠানোর কথা বলে, তাঁর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ সহ পরিচিত সাধারন লোকের কাজ থেকে সবমিলিয়ে মোট ২৬ জনের কাছ থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অধিকাংশ আত্মীয় স্বজন সুনামগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা। এমন ভূয়া জাপান যাওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল গত ২৭/৩/২০২৫ ইং তারিখ রাত ১২ ঘটিকায় জাপান এয়ারলাইন্স। এমন তথ্য গোপন রেখে আমাকে বিমানবন্দরে কাজের কথা বলে চলে যান প্রতারক হাবিব। সেখানে আমার পরিচিত জনের কাছে জানতে পারি, আমার নাম ব্যবহার করে সাধারন মানুষকে জিম্মি রেখে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। সকলের পাসপোর্ট, টিকেট ও ভিসা দেয়ার কথা বলে সবকিছু নিয়ে বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশনে ঢুকে যায় হাবিবুর রহমান এবং সারারাত অপেক্ষা করার পরেও বিমানবন্দর থেকে সে বের না হওয়ায় টেনশনে পড়েন ওই সকল ভূক্তভোগী লোকজন। তখন আমি ভূক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সে কল রিসিভ করেনি এবং পরবর্তীতে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায়, সারারাত তাঁকে না পেয়ে সকালে যার যার মতো করে বাসায় ফিরেন তারা।
রাজু বলেন, পরে আমরা জানতে পারি তার বাসায় বসে তাঁর ছেলেকে নিয়ে এই ভূয়া ভিসার কাগজগুলো বানানো হয়েছে। বর্তমানে তাঁর ফোনে কল দিলে সে ফোন রিসিভ করেনা। ভূক্তভোগীদের অভিযোগ মতে সরলমনা সুযোগে প্রতারক হাবিবুর রহমান এমন একটি কাজ করেছে, যার জন্য আজ ২৬টি পরিবার পথে বসে গেছে।
রাজু আরও বলেন, আপনাদের সাংবাদিকদের কাছে একটি লিখিত প্রেস নোট অভিযোগের মাধ্যমে এই অভিযুক্ত প্রতারক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ভূক্তভোগীদের ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা এবং আমার পাওনা ৮ লাখ টাকা তাঁর কাছ থেকে ফেরত পেতে প্রশাসন আমাদেরকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে বলে এমনটি প্রত্যাশা করেন রাজু।
এবিষয়ে ভূক্তভোগী হানিফ প্রধান নামের এক ব্যক্তি জানান, আমার গ্রামের বাড়ি মতলব এলাকায়, আমি নারায়ণগঞ্জের একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করি। এই সুবাদে বসবাস করি কাঁচপুর এলাকায়, এবং পাশাপাশি জমিজমারও ব্যবসা বাণিজ্য করে থাকি। এ ব্যবসার সুবাদে আমার সাথে প্রতারক হাবিবুর রহমানের কাছে পরিচয় মিলে। এক পর্যায় তাঁর সাথে সখ্যতা গড়ে উঠলে, তিনি জাপানে লোক পাঠায় বলে এমনটি জানান। পরবর্তীতে আমার পরিবারের এক ছেলে নাজমুল ইসলাম সাইম এবং আমার ছোট ভাই হান্নান নামের দুইজনকে পাঠানোর জন্য কন্টাক্ট করি। তখন হাবিব তাঁদের পাসপোর্ট জমা দেয়ার কথা বলে, দুই ধাপে মোট ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে নেন। এমতাবস্থায় কিছুদিনের মধ্যে মুঠোফোনে জানান ২৮/০৩/ ২০২৫ তারিখ ওদের রাত ১ টা ৫ মিনিটে ফ্লাইট। এমন তথ্যে পেয়ে তাঁদের নিয়ে ওই তারিখে রাতে ৮ টায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছাই। যেয়ে দেখি তাঁর কোন খবর নাই, কিন্তু আমাদের মতো আরও এমন ভূক্তভোগী সেখানে লক্ষ্যে করা গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমানবন্দরে হাবিব পৌঁছে এসে বলে, যে লোক আপনাদের জাপানে পাঠাবে তিনি ফোন বন্ধ করে রাখছে। এমন প্রতারণার তথ্যে পেয়ে আমরা সকলে মিলে বিমানবন্দরের উপস্থিত কর্মকর্তা এবং বিমানবন্দর থানা পুলিশের সহযোগীতায় তাঁকে থানায় নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে আইনের দ্বারস্থ্য হই।
হানিফ আরও বলেন, পরবর্তীতে তিনি একটি মিমাংসার কথা বলে, থানায় মুচলেকা দিয়ে আমাকে ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা প্রদান করেন। এবং বাকী ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার চেক প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে চেকের ডেট অনুযায়ী ব্যাংকে গিয়ে দেখি, ওই একাউন্টে কোন টাকা নাই। সুতরাং হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিষয়ক অতিরিক্ত পরিচালক তাঁর অফিস কক্ষে লিফটের ৭-এ গিয়ে আমার পাওনা টাকার বিষয় বললে, এখন পর্যন্ত তিনি টাকা দিচ্ছেন না।
হানিফ বলেন, এজন্য আমি নিরুপায় হয়ে আপনাদের সাংবাদিকদের মাধ্যমে এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একান্ত সহযোগীতায় আমার টাকা ফেরত চাই। এবং এমন চিহ্নিত প্রতারকের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মনে করেন ভূক্তভোগী হানিফ প্রধান।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিষয়ক অতিরিক্ত পরিচালক প্রতারক হাবিবুর রহমানকে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও, তিনি ফোন রিসিভ করেন না।
Tags: বাংলাদেশ




