ইব্রাহিম রাইসি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। ২০২১ সালে যিনি রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ঐক্যকে সুসংহত করতে নিবেদিত প্রান ছিলেন। হাসান রুহানির পর ইরানের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হন তিনি।
ইব্রাহিম রাইসির জন্ম গ্রহন করেছিলেন ইরানের দ্বিতীয় বড় শহর মাশাদে ১৯৬০ সালে। ইরানের পবিত্রতম শিয়া দরগাটি রয়েছে এই শহরে। রাইসির বাবা ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা। ইব্রাহিম রাইসির বয়স যখন পাঁচ তখন তার বাবা ইন্তেকাল করেন। ইরানের ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি ইসলামের নবীর বংশধরদের মত কালো পাগড়ি পরতেন। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি ১৫ বছর বয়সে পবিত্র কুম শহরে এক মাদ্রাসায় যোগ দেন। সেখানে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়, তিনি পশ্চিমা সমর্থিত শাহ-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিপ্লবে অংশ গ্রহন করেন। অবশেষে ১৯৭৯ সালে আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ-এর শাসনের পতন ঘটলে তিনি যোগ দেন বিচার বিভাগে এবং আয়াতোল্লা খামেনির কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে বেশ কয়েকটি শহরে কৌঁসুলির দায়িত্ব পালন করেন।
৬৩ বছর বয়সী রাইসি ২০২১ সালে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশটির মরালিটি বা নৈতিকতা বিষয়ক আইন কঠোর করার নির্দেশ দেন। একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো তাকে। এ কারণে তিনি সরকার বিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের মুখেও পড়েছেন। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর সাথে পারমাণবিক আলোচনায় তিনি কঠোর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য রাইসি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন বলে অনেকেই মরন করে থাকেন। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা তাকে বিচার বিভাগের প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
রাইসি অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবেও নির্বাচিত হন। ৮৮ সদস্যের এই বোর্ড দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে থাকে। ৬৩ বছরের এই সাবেক বিচার বিভাগীয় প্রধান ব্যাপকভাবে জয়ী হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। এমন একটা সময় রাষ্ট্রপতির পদে শপথ গ্রহণ করেন রাইসি যখন ইরান তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যা, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। রাইসি দায়িত্বভার গ্রহণের পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী থেকেছে ইরান যার মধ্যে ২০২২ সালে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, গাজায় ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধ। গাজায় চলমান যুদ্ধের সময়েই কিন্তু ইরান এবং ইসরায়েলের ছায়া যুদ্ধ প্রকাশ্যে চলে আসে। তার কর্মজীবন বেশ ঘটনাবহুল। বিচারবিভাগীয় ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। খুব অল্প বয়সে সাফল্য পান তিনি। কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তার। মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে শুরু করে কট্টর পন্থার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমালোচনার শিকার হয়েছেন তিনি।
তবে নিজের কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমালোচনার মুখে পড়লেও ইরানের জনগনের কাছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যু ইরানের জন্য বিরাট এক ধাক্কা ছিল বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক চলে আসছে ইরানের। ইব্রাহিম রাইসি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় প্রতিবেশীদের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং অনেটাই সফল হয়েছিলেন।
১৯ মে ২০২৪ সালে রবিবার ইব্রাহিম রাইসি পূর্ব আজার বাইজানের প্রদেশে জলপাই এলাকায় প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলীর সাথে জলাধার প্রকল্প উদ্বোধন শেষে ফেরার পথে রাইসিকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার ইরানের উত্তর-পশ্চিমে ভারজাকান এলাকার একটি বনে বিধ্বস্ত হয়। ওই দূর্ঘটনায় ইব্রাহিম রাইসি, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হোসেন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান সহ হেলিকপ্টারে থাকা সবাই অর্থাৎ ৯জন শাহাদাত বরন করেন।
ইরানের শহীদ প্রেসিডেন্ট সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রায়িসি ছিলেন একজন মানব দারদী মানুষ। তিনি দেশ ও জাতীর জন্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ও নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি দেশের সেবায় এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটে বেরিয়েছেন। তিনি কেবল নিজ দেশ ও তার দেশের জনগণের জন্যই কাজ করেনি। তিনি বিশ্বমানবতার জন্য কাজ করেছেন। বিশ্বের মজলুম মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তার সময়ে মুসলিমদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে ইরানের সম্পর্ক আরো বেশি শক্তিশালী হয়েছে। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও তার সফরসঙ্গীদের শাহাদতের ফলে কেবল ইরানি জাতি ও মুসলিম উম্মার নয়, সমগ্র ইসলামী উম্মার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মত নয়। তিনি ফিলিস্তিনসহ সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন। আর এর কারণেই তার শাহদতে সারা বিশ্বের মানুষ কেঁদেছে। তার জানাযায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শহীদ প্রেসিডেন্ট সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসির পথ অনুসরণ করে এই দেশ ও জাতিকে আরো দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই সকলের বিশ্বাস।
বীর সোনানী সৈয়দ ইব্রাহিম রাইসি আল-সাদাতির দ্বীতিয় শাহাদাত বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করি।
[ লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]
E-mail : gmbhuiyan@gmail.com




