চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। এ সময় তিনি শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন এবং ১৯৮২ সাল থেকে ‘লোকায়ত’ নামক প্রগতিশীল সাময়িকপত্র সম্পাদনা করে আসছিলেন। একুশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪), রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। এ ছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম।
অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন দুই সন্তানের জনক আবুল কাশেম ফজলুর হক। কণ্যা শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপন হত্যাকান্ডের শিকার হন উগ্রবাদী গোষ্টি কর্তৃক। পত্র হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ, হতাশ পিতা সে দিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’ পুত্র হারানোর শোকে কাতর একজন পিতা হিসাবে তিনি প্রতিশোধের ভাষায় কোন কথা বলেন নাই, কোন অশুভ বা অনৈতিক শব্দ উচ্চারন করেন নাই। তিনি কেবলমাত্র হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে নিজের দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। বরং তিনি উচ্চারন করেছিলেন, তার সন্তানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যদি মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, যদি সমাজ ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তা হলেই সেই মৃত্যু অর্থবহ হবে। তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কয়েকজন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার, জেল কিংবা ফাঁসি দিলেই সমাজের গভীর অসুস্থতা তৈরী হয়েছে তা দূর হবে না। তিনি তার উপলব্ধিকে প্রতিধ্নীত করেছিলেন যে, জন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, নৈতিক জাগরণ এবং সামাজিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। এই উচ্চারণ কেবল একজন শোকাহত পিতার মনের গভীর থেকে উচ্চারিত কোন সাধারণ বক্তব্য ছিল না, ছিল একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সন্তান হারানোর অসীম বেদনার মধ্যেও যিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণের কথা ভাবতে পারেন, তিনি নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের কাতারে পড়েন না। তিনি অনন্য মানবিক উচ্চতায় পৌঁছানো মানুষদের একজন।
আজকের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন শিক্ষকের সংখ্যা খুব বেশি নেই, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে পড়ে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাদেরই একজন, যার নাম শুনলে একবাক্যে সকলে বলবেন তিনি এক বিরল প্রজাতির এক মানুষ। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সে কথা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন তার প্রত্যক্ষক্ষশিক্ষার্থীরা। ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তা জানার সুযোগ হয়েছে অল্পই আমার। তবে, যতটুকু জানতে পেড়েছি তাতে বলতেই হয়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহংকার এবং শিক্ষার্থীবান্ধব। তার মধ্যে কখনো শিক্ষকদের সেই দূরত্ব সৃষ্টি করা আত্মগরিমা কিংবা উদ্ধত মনোভাব চোখে পড়েনি। তিনি মন দিয়ে শুনতেন, সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন এবং এমনভাবে কথা বলতেন যেন তিনি শেখাচ্ছেন না, বরং একসঙ্গে ভাবছেন। একজন সত্যিকারের শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রজ্ঞা নয়, তার মানবিকতা। সেই মানবিকতার পরীক্ষায় আবুল কাসেম ফজলুল হক অসাধারণভাবে উত্তীর্ণ ছিলেন। ধর্ম, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র নিয়ে তার চিন্তাভাবনাও ছিল গভীরভাবে বাস্তবিক ও মানবিক। তিনি মনে করতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা রাষ্ট্রধর্ম যেকোনো প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যদি সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং সংঘাত সৃষ্টি হয়, তবে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জাতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠবে।
মতাদর্শের চেয়ে মানুষ, প্রতিশোধের চেয়ে পুনর্মিলন, বিভাজনের চেয়ে ঐক্য- এই স্বপ্নই ছিল তার জীবনদর্শনের মূল বক্তব্য। আজকের বাংলাদেশে যখন প্রায়ই দেখা যায় মতের ভিন্নতার কারণে মানুষ মানুষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনীতির মঞ্চ- সর্বত্র ভাষা ক্রমশ আক্রমণাত্মক, অসহিষ্ণু এবং বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে। ঠিক এমন সময় অধ্যাপক সময় আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্র ও সমাজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। তিনি আমাদের শিক্ষা দিতেন, একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো বিভক্ত সমাজকে আরও বিভক্ত করেন না; বরং মানুষকে সংলাপ, সহমর্মিতা, মানবিকতার এবং ঐক্যের পথ দেখায়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন নীতিবাদী রাজনৈতিক দার্শনিক ছিলেন। তার সকল চিন্তা ও লেখায় উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির চিন্তা ও আশার প্রকাশ থাকে। তিনি শুধুমাত্র একজন লেখক বা অধ্যাপক নন; তিনি ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি সাধারণ মানুষের মুক্তি ও সমাজের অগ্রগতি নিয়ে ভাবতেন। তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও সম্পাদনা বাংলাদেশের চিন্তা জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি সমকালীন সমাজে প্রগতির আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন। তার কর্মমুখী চিন্তাশীলতা অনুশীলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে তার যুক্তিগ্রাহ্য বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণামূলক রচনা আমাদের চেতনা ও বিবেচনাবোধকে শাণিত ও সমৃদ্ধ করছে।
আবুল কাশেম ফজলুল হক দেশের শ্রমিক-কৃষক, গরিব মেহনতি মধ্যবিত্ত সাধারণ জনগণের একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রথম সারির রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নতির জন্য লিখতেন এবং দেশ ও সমাজের অগ্রগতির বিষয়ে চিন্তাশীল ছিলেন। তার চিন্তাচেতনার মধ্যে কেবলই ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। দল–মতের ঊর্ধ্বে উঠে আজীবন তিনি দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন, লিখেছেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশপন্থী মানুষ ও বুদ্ধিজীবী। যিনি বিশ্বাস করতেন, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন টেকসই হয় না। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রবন্ধ লিখতেন। প্রবন্ধকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।
তিনি কোনো প্রশাসনিক পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিংবা সুবিধাভোগী অবস্থানের কারণে সম্মানিত হননি; বরং তিনি সম্মান অর্জন করেছিলেন তাঁর স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, নির্লোভ জীবনযাপন এবং সত্য উচ্চারণের সাহসের মাধ্যমে। তাই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা তাঁকে কেবল একটি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। যাঁরা কখনো তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন না, তাঁরাও তাঁর বই, লেখা ও বক্তব্যের মাধ্যমে চিন্তার নতুন দিগন্তের সন্ধান পেয়েছেন। তিনি মানুষকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করতে শেখাননি; বরং শিখিয়েছেন কীভাবে যুক্তির আলোকে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে হয় এবং কীভাবে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে হয়। সমাজবাদী চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকলেও তিনি কোনো মতবাদের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। তিনি মতাদর্শের চেয়ে বিবেক, আনুগত্যের চেয়ে যুক্তি এবং বিভাজনের চেয়ে মানবিক সংহতিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক ‘নিঃসঙ্গ সারথি’, যিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর আদর্শে অটল ছিলেন। এ দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মানুষের কল্যাণে পরিবর্তন কীভাবে হবে, সে চিন্তাই সারা জীবন করে গেছেন তিনি। কিছু ক্ষতি রয়েছে, যার কোনো প্রতিস্থাপন হয় না। আবুল কাসেম ফজলুল হকের চলে যাওয়া তেমনই এক ক্ষতি। আরেকজন আবুল কাসেম ফজলুল হক তৈরি হতে কত সময়, কত বছর লাগবে বা কত যুগ লাগবে, সে নিশ্চয়তা কারও কাছেই নাই। তার মৃত্যু আমাদের সমাজের বিশ্বস্ত রাষ্ট্র চিন্তকের যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়। একটি বিভক্ত, মেরুকৃত এবং ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা সমাজে তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত আলোকিত মানুষ কেবল তিনি নন, যিনি অনেক কিছু জানেন; বরং তিনি, যিনি নিজের জ্ঞানকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক সাহসে রূপান্তরিত করতে পারেন তিনিই।
অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের অমন স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
[লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মী]
E-mail : gmbhuiyan@gmail.com




