মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন অভিজ্ঞতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মক্ষমতা কিছুটা কমে এলেও জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সামাজিক অবদান কোনোভাবেই কমে যায় না। বরং একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ধারক- বাহক প্রবীণরা। অথচ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্ব, অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই প্রবীণদের সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। এর ফলে আগামী দিনে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উন্নত সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণসহ অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও প্রবীণদের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রবীণদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার জায়গা হওয়া উচিত পরিবার। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোয় বাবা-মা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের দীর্ঘ সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং জীবনের ব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবারে প্রবীণরা আগের মতো সময় ও সঙ্গ পাচ্ছেন না। সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে থাকছেন, অনেক প্রবীণ একা বসবাস করছেন। কেউ কেউ আবার পরিবারের মধ্যেই মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি প্রবীণদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ।
প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব শুধু নিয়মিত খাবার বা ওষুধের ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, সময় দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখাও জরুরি। পরিবারের ছোটদেরও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে। একজন প্রবীণ মানুষ যেন নিজ ঘরেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন, সেটি নিশ্চিত করা পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্বাস্থ্যসেবা প্রবীণ সুরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, হাড়ের দুর্বলতা, স্মৃতিজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু অনেক প্রবীণ নিয়মিত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ পান না। আবার চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবীণবান্ধব সেবা জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সুযোগ বাড়াতে হবে।
প্রবীণদের নিরাপত্তার সঙ্গে চলাচলের বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার, গণপরিবহনে ওঠানামা কিংবা ব্যস্ত সড়কে চলাচলের সময় প্রবীণরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় তাঁদের বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়। গণপরিবহনে পর্যাপ্ত আসন, নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা এবং চালক-হেলপারদের আচরণও তাঁদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রবীণবান্ধব সড়কব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা তৈরি, পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং ও পথচারী সংকেত স্থাপন এবং গণপরিবহনে প্রবীণদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
একটি প্রবীণবান্ধব নগর কেবল বড় বড় ভবন বা প্রশস্ত সড়ক দিয়ে তৈরি হয় না। নগর পরিকল্পনায় মানুষের বয়স ও সক্ষমতার বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিতে হয়। পার্ক, খোলা জায়গা, বসার স্থান, গণশৌচাগার, নিরাপদ হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত আলো এবং সহজে প্রবেশযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রবীণদের জীবনকে অনেক সহজ করতে পারে। হাসপাতাল, ব্যাংক, সরকারি অফিস ও গণপরিবহনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন কমানো এবং অগ্রাধিকার সেবা চালু করাও প্রয়োজন।
প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর অনেক মানুষের আয় কমে যায় বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যাঁদের অবসরকালীন সঞ্চয় বা পেনশন নেই, তাঁদের জন্য জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, ভাতা প্রদানে স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রবীণদের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারলে তাঁদের জীবনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে।
তবে আর্থিক সহায়তা দিয়েই প্রবীণদের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবসর গ্রহণের পর অনেকেই মনে করেন তাঁদের সামাজিক ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে। এই ধারণা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যেতে পারে। তাঁদের দিয়ে তরুণদের পরামর্শমূলক কার্যক্রম, স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ, শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ পরিচালনা করা সম্ভব। এতে প্রবীণরা যেমন নিজেদের প্রয়োজনীয় মনে করবেন, তেমনি সমাজও তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের যুগে প্রবীণদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিও জরুরি। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিমেডিসিন, সরকারি সেবা ও যোগাযোগের বড় অংশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু অনেক প্রবীণ এসব ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন না। তাঁদের জন্য সহজ ভাষায় ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, নিরাপদ অনলাইন লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতারকচক্র প্রবীণদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা ও অবহেলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, সম্পত্তি দখল, আর্থিক প্রতারণা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক প্রবীণ সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কিংবা অসহায়ত্বের কারণে এসব ঘটনা প্রকাশ করেন না। তাঁদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে প্রবীণ নির্যাতনকে ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণদের তালিকা, প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, সামাজিক মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং যুবসমাজকে যুক্ত করলে এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
গণমাধ্যমও প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবীণদের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন, বিশেষ অনুষ্ঠান, জনমত গঠন এবং সফল প্রবীণদের জীবন ও অবদান তুলে ধরা দরকার। প্রবীণদের শুধু সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে নয়, সমাজের সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের সুরক্ষা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান করে, সেই সমাজ মানবিক মূল্যবোধকে সম্মান করে। প্রবীণদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি তাঁদের অধিকার।
প্রবীণদের সুরক্ষায় পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে, রাষ্ট্রকে কার্যকর নীতি ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় প্রশাসনকে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে, চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি মানুষকে মানবিক আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক, গণপরিবহন, নগর পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাকে প্রবীণদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সাজাতে হবে।
প্রবীণরা আমাদের অতীতের সাক্ষী, বর্তমানের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত শিক্ষার উৎস। তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন একাকিত্ব, অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতায় না কাটে, তা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলেই একটি প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু তাঁদের জীবনকে নিরাপদ করা নয়, বরং সমাজের মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সভ্যতার মানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। তাই প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
[লেখক পরিচিতি :
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)lionganibabul@gmail.com]




