সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি নির্বাচন কমিশনের কাছে শাপলাকে দলীয় প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে এবং একজন সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি গভীরভাবে মনে করি এই আবেদনকে অনুমোদন দিলে তা সংবিধানের চেতনা, ঐতিহাসিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক শালীনতার বিরুদ্ধে যায়। এর উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। নিকট অতীতে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারী মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ‘নাগরিক ঐক্য’ শাপল প্রতীক চেয়েও পায়নি। নির্বাচন কমিশন ‘শাপলা’কে জাতীয় প্রতীক বলে তখন তাদের বরাদ্দ না দিয়ে ‘কেটলি’ প্রতীক বরাদ্দ দেন। এখন প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’ যদি কাউকে বরাদ্দ দিতেই হয় তবে তা কেন আগে চেয়েও নাগরিক ঐক্য পাবে না?
জাতীয় প্রতীক দলীয় সম্পত্তি নয়, এটি জাতির ঐক্যের ভিত্তি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
“The national symbols of the Republic shall be the national flag, the national anthem, and such other national symbols or emblems as may be declared by the Government.”
এখানে “such other national symbols” বলতে জাতীয় ফুল, জাতীয় পশু, জাতীয় ফল, জাতীয় পাখি ইত্যাদি প্রতীক বোঝানো হয়েছে। সংবিধান এই প্রতীকগুলোর মর্যাদা নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন হিসেবে নির্ধারণ করেছে, যা কোনো দলের বা গোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না।
রাষ্ট্রপতির আদেশ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিভিন্ন নির্দেশনায় বারবার বলা হয়েছে জাতীয় প্রতীককে বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং ‘শাপলা’কে দলীয় প্রতীক বানানো মানে সংবিধান লঙ্ঘন এবং একটি অরাজনৈতিক জাতীয় চেতনাকে দলীয় ব্যানারে পরিণত করা।
শাপলা: ইতিহাস, স্বাধীনতা ও জাতীয় পতাকার অন্তর্গত।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে যে জাতীয় পতাকা গৃহীত হয়, তার মধ্যেই শাপলা ছিল। পরবর্তীতে জাতীয় পতাকায় সরাসরি শাপলার প্রতিকৃতি না থাকলেও তার ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনা রাষ্ট্রীয় প্রতীকের মাধ্যমে বহাল রয়েছে। শাপলা আমাদের নদীভিত্তিক সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং সংগ্রামী আত্মপরিচয়ের রূপক। কাজেই শাপলাকে দলীয় প্রতীকে পরিণত করার যে কোনো প্রয়াস জাতীয় ঐতিহ্যকে সংকুচিত করে।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং প্রতীক নির্বাচন: সতর্কতার দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে রাজনৈতিক দলসমূহ যে প্রতীক বেছে নিয়েছে, তাতে জাতীয় প্রতীক ব্যবহার থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকার চর্চা ছিল। যেমন: আওয়ামী লীগ-নৌকা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-ধান শীষ, জাতীয় পার্টি-লাঙ্গল, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-দাড়িপাল্লা, নাগরিক ঐক্য-কেটলি, গণঅধিকার পরিষদ-ট্রাক, বাম গণতান্ত্রিক জোটের বিভিন্ন দল-হাতুড়ি-ফালা, কাস্তে প্রভৃতি। এইসব প্রতীক দেশের মানুষের জীবনের অংশ হলেও কোনোটিই জাতীয় প্রতীক নয়। তারা প্রতীক বেছে নিয়েছে এমনভাবে, যাতে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় ফুলের মর্যাদা দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে থাকে। এমনকি ক্ষুদ্র দলসমূহও মাছ, পাখি, কুঁচি, জাহাজ, চাকা ইত্যাদি বেছে নিয়ে নিজেদের আলাদা পরিচিতি গড়েছে। জাতীয় ফুল বা জাতীয় পশু এসব স্পর্শকাতর প্রতীক কেউ স্পর্শ করেনি, কারণ এদের রয়েছে সংবিধান নির্ধারিত সর্বজনীন মর্যাদা।
আন্তর্জাতিক রেফারেন্স: জাতীয় প্রতীকের দলীয় ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ।
বিশ্বের বহু দেশে জাতীয় প্রতীক দলীয় ব্যবহারের ব্যাপারে রয়েছে কড়া বিধিনিষেধ। ভারতে জাতীয় পতাকা, অশোক স্তম্ভ বা বাঘকে কোনো দল ব্যবহার করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পাখি বাল্ড ইগল, জাতীয় পতাকার রাজনৈতিক ব্যবহার সীমিত। জার্মানি, ফ্রান্স ও কানাডা-তেও জাতীয় প্রতীক দলীয় স্বার্থে ব্যবহারে রয়েছে আইনগত নিষেধাজ্ঞা। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকে এ ধারা বজায় ছিল এবং তা জারি রাখাও জরুরি। নয়তো ভবিষ্যতে জাতীয় সংগীতকে দলীয় প্রচারণায় ব্যবহার করার মতো বিকৃতি দেখা দেবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় প্রয়োজন দৃঢ় সাংবিধানিক অবস্থান।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধুই ভোটগ্রহণ ও প্রতীক বরাদ্দে সীমাবদ্ধ নয়। কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মান-উন্নয়ন সুরক্ষিত রাখা। নির্বাচন কমিশন আইন ২০০৯-এর ৯(৩) ধারা বলছে:
“The Commission shall, while allocating symbols, consider public sentiment, national importance and constitutional values.”
এই আইনি কাঠামোর আলোকে ‘শাপলা’ প্রতীক হিসেবে কোনো রাজনৈতিক দলকে বরাদ্দ দেওয়া হলে, কমিশন নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে। আর তেমন ব্যর্থতা হবে জাতীয় ঐক্য, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিরুদ্ধে এক প্রশাসনিক আত্মসমর্পণ।
নৈতিক প্রশ্ন: শাপলা কি একদিন শুধু একটি দলের নাম হয়ে যাবে?
ধরে নেওয়া যাক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কে শাপলা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হলো। তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ফুলের মানে কী দাঁড়াবে? তারা হয়তো বলবে “শাপলা মানেই অমুক দল”। এতে জাতীয় প্রতীক সংকুচিত হয়ে যায় দলীয় আইডেনটিটিতে, যা সাংস্কৃতিক দিক থেকে চরম ক্ষতিকর এবং ঐক্যবোধের জন্য বিপজ্জনক।
শাপলা জাতির, কোনো দলের নয়
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা আমাদের রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার প্রতীক। এটি আমাদের জাতিগত সম্মান ও সংবিধানিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। একে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীকে পরিণত করা মানে সমগ্র জাতির মালিকানায় হস্তক্ষেপ করা। শাপলা হলো আমাদের সবার। এটি কারও একক দলীয় অস্ত্র হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের কাছে জোরালোভাবে আহ্বান জানাই এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করুন, সাংবিধানিক মান রক্ষা করুন, জাতীয় ঐক্যকে দলীয় বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করুন।
[লেখক:
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
মোবাইল: ০১৭৩০৯৮৪০৮৬]




