নিজস্ব প্রতিবেদক-♦♦
রাজধানীর একটি ঐতিহ্যবাহী হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের তিন দশকের প্রথম পুরুষ নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত করা হয়।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপি আয়োজিত জাতীয় নির্বাচনোত্তর প্রেস ব্রিফিংয়ে শনিবার দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এ সময় তিনি বলেন, জনগণকে আমাদের পক্ষে আনা এবং তাদের আস্থা অর্জন করাটাই ছিল আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। তাতে আমরা সফলও হয়েছি। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাই হবে তাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সরকার গঠনের পথে। এমন পরিস্থিতিতে ভোটানুষ্ঠানের দুদিন পর তিনি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
এ সময় আল-জাজিরা,বিবিসি, এবিসির মতো বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
তারা বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক খাতের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারেক রহমানকে প্রশ্ন করেন। বিএনপি চেয়ারম্যান সাবলীলভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দেন। পরে সাংবাদিকদের আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
নির্বাচনের আগে থেকে তারেক রহমান বলে আসছিলেন- এ নির্বাচন বিএনপির জন্য সহজ হবে না। তার এ বক্তব্যের সূত্র ধরে নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ঠিকানার সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন জানতে চান, বিএনপির জন্য নির্বাচন কতটা কঠিন ছিল এবং জয়ের জন্য কোনো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে হয়েছে কিনা? জবাবে তারেক রহমান বলেন, জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাটাই কঠিন ছিল। যে কোনো ভালো কাজ, লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে কষ্ট তো হবেই।
ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রাজ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবে।
ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা কীভাবে হবে- জানতে চান যুক্তরাজ্যের দ্য ইনডিপেনডেন্টের সাংবাদিক আলিশা রহমান সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ভাগ্নি যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতির মামলা এগিয়ে নিয়ে যাবেন কিনা, সেই প্রশ্নও করেন তিনি। এ প্রশ্নের জবাব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশ কেন্দ্র করে হবে না।
সরকার গঠন করার পর বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ কী হবে, তা জানতে চান কাতারভিত্তিক আল জাজিরার একজন সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে ঠিক করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করেছে। সে জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়ন এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ কৌশলকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য কীভাবে দেখছেন- চীনের এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করব, যা কিছু বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে না, স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেদিকে যাব না।’ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা যদি দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেব।
তরুণদের বিএনপি কতটা গুরুত্ব দেবে- এমন প্রশ্ন করেন একজন বিদেশি সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, আমরা অবশ্যই তরুণদের কথা শুনব। কিন্তু সমাজে আরও অনেকে রয়েছেন। সবার কথা ভাবতে হবে। আমাদের ইশতেহারেও আমরা সবার কথা বলেছি। সেখানে তরুণের কথা আছে, বয়স্কদের কথা আছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা আছে, নারীদের কথা আছে।
শেখ হাসিনার বিচার এবং সার্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে জানতে চান পাকিস্তানের জিও নিউজের সাংবাদিক এজাজ সাইদ। তারেক রহমান বলেন, সার্ক গঠনের উদ্যোগটি ছিল বাংলাদেশের। আমাদের সরকার সার্ককে সক্রিয় করতে চায়। সরকার গঠনের পর আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব। শেখ হাসিনার বিচারের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, এটি আইনিব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
সংবাদ সম্মেলনে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কোন খাতকে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে- জানতে চান চীনের আরেকজন সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, অনেকের মতো চীনও বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে দুই দেশই একসঙ্গে কাজ করবে।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক বাংলাদেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করতে বিএনপির পরিকল্পনা জানতে চান। তারেক রহমান বলেন, তারা আরও বেশি ব্যবসা নিয়ে আসবেন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবেন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে বিগত সরকারের কর্মী-সমর্থকরা রয়েছেন। তাদের মূল ধারায় ফেরানোর পরিকল্পনা জানতে চান একজন বিদেশি সাংবাদিক। জবাবে তারেক রহমান আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন সবার জন্যই সমান। আমরা চেষ্টা করব আইন যেন আইনের মতো করে চলে।
বিগত সরকারের আমলে অলিগার্ক তৈরি করে অর্থনীতি ধ্বংস করা হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন সরকার কী পদক্ষেপ নেবে- জানতে চান চ্যানেল ২৪-এর সাংবাদিক জহিরুল আলম। জবাবে তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি হবে। সবাই সবার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারবেন। কোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ দেওয়া হবে না।
শুরুতে বিএনপি চেয়্যারম্যান তার দলকে সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বক্তব্য দেন। এরপর আসে প্রশ্নোত্তর পর্ব। অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, মীর নাসির, আহমেদ আজম খান, আসাদুজ্জামান রিপন, আবদুস সালাম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আফরোজা আব্বাস, মিডিয়া সেলের মওদুদ হোসেন আলমগীর, আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান, জাহিদুল ইসলাম রনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।




