গাজীপুর জেলায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ভূলে আরএস রেকর্ডে বনবিভাগের নামে গেজেটভুক্ত করা হয়। এতে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। জমির মালিকগণ নিস্কন্টকভাবে তাদের জমি ভোগদখল বা ব্যবহার করতে পারছে না। নিজের জমিতে ঘরবাড়ি কিংবা স্থাপনা নির্মাণ করতে চাইলে বনবিভাগ বাধা প্রদান করেন। জমির মালিকগণ দখলীয় জমি বিক্রয় কিংবা ক্রয় করতে পারছেন না এবং ব্যাংক ঋণও নিতে পারছেন না। এসকল জমির ভূমি উন্নয়ন কর (রাজস্ব) সরকার গ্রহণ করছে না।
গেজেটভুক্তকরণ একটি গুরুতর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করে এবং তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বনভূমি সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব। পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই না করা হয়, তাহলে তা উল্টো জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে সকল জমি ব্যক্তির নামে সিএস, এসএ ও আরএস সঠিকভাবে রেকর্ডভূক্ত হয়েছে, সেসকল জমির হস্তান্তর, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান ও অন্যান্য ব্যবহার যেন জমির মালিকগণ অবাধে করতে পারেন তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে অবিলম্বে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রজ্ঞাপণ জারি করা আবশ্যক।
এই সমস্যার মূল কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংশোধনের দুর্বলতা। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জরিপ পরিচালিত হয়েছে সি.এস, এস.এ, আর.এস, এবং সর্বশেষ ডিজিটাল জরিপ। এসব জরিপের মধ্যে তথ্যগত অসামঞ্জস্য এবং আপডেট না হওয়া রেকর্ড অনেক ক্ষেত্রে ভুল মালিকানা নির্ধারণের কারণ হয়েছে। গাজীপুরের ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, কিছু এলাকায় বনভূমি সম্প্রসারণের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও বনবিভাগের আওতায় অন্তর্ভুক্ত ও তা গেজেটভূক্ত করা হয়েছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব। ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বনবিভাগের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একই জমি একাধিক সংস্থার দাবির আওতায় পড়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ পড়ছেন চরম বিভ্রান্তিতে। তারা বুঝতে পারছেন না, তাদের জমির প্রকৃত মালিক কে রাষ্ট্র, বনবিভাগ, নাকি তারা নিজেরাই।
এই জটিলতা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই, এর বাস্তব প্রভাব অত্যন্ত গভীর। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জমির মালিকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছেন না, কারণ জমির খতিয়ানে বনবিভাগের নাম উল্লেখ আছে। আবার কেউ জমিতে ঘর নির্মাণ করতে গেলে প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া এই পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিচ্ছে। জমির মালিক এবং বনবিভাগের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলও এই সুযোগে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই সমস্যার সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভূমি জরিপ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল ম্যাপিং এবং জিআইএস (Geographic Information System) ব্যবহার করে জমির প্রকৃত অবস্থান এবং মালিকানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে ভুল রেকর্ডের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যাবে।
ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বনবিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে বিতর্কিত জমিগুলো যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। যেখানে প্রকৃত মালিকানা প্রমাণিত হবে, সেখানে দ্রুত রেকর্ড সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। বর্তমানে ভূমি সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার ব্যবস্থা চালু করা হলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষ তাদের জমির রেকর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করেন না বা জরিপ কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন। ফলে তারা অজান্তেই সমস্যার মধ্যে পড়ে যান। এ বিষয়ে গণমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
এই সমস্যাকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি একটি মানবিক এবং অর্থনৈতিক সংকটও বটে। একটি পরিবার তাদের জীবনের সঞ্চয় দিয়ে যে জমি ক্রয় করে, সেই জমির মালিকানা হারানোর ভয় তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই এই সমস্যার দ্রুত এবং কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
গাজীপুরের এই সমস্যা পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে এমন জটিলতা দেখা দিতে পারে। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যাবশ্যক। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে এখন প্রয়োজন সমাধানের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ। গাজীপুরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দ্রুত যাচাই করে বনবিভাগের গেজেট থেকে অবিলম্বে অবমুক্তি ও ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশাসনিক ত্রুটি রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
[লেখক পরিচিত :
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক),E-mail:lionganibabul@gmail.com]




