সৈয়দা রাশিদা বারী-¤
নারী ও কন্যাশিশুরা, যারা আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, এখনও তাদের অধিকার, সুযোগ, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক কল্যাণকে প্রভাবিত করে এমন অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
তাঁদের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে স্থায়ী সমস্যাগুলোর একটি হলো লিঙ্গবৈষম্য। প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতিগুলো প্রায়ই কন্যাশিশুদের তুলনায় পুত্রসন্তানদের বেশি প্রাধান্য দেয়, যা পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে অসম আচরণের দিকে নিয়ে যায়।
অনেক পরিবারে শিক্ষা, পুষ্টি, চিকিৎসা ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ছেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রায়ই আশা করা হয় যে, কন্যাশিশুরা অল্প বয়স থেকেই গৃহস্থালির কাজ করবে, ফলে শিক্ষা ও ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তাদের হাতে থাকা সময় কমে যায়। এই বৈষম্য লিঙ্গভিত্তিক ধ্যানধারণাকে আরও শক্তিশালী করে এবং কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ সুযোগ সীমিত করে।
দেশের মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে। অনেক কন্যাশিশু, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে বাধার মুখোমুখি হয়। অর্থনৈতিক সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর দীর্ঘ দূরত্ব এবং হয়রানির আশঙ্কা নিয়মিত উপস্থিতিকে নিরুৎসাহিত করে। কিছু ক্ষেত্রে সম্পদ সীমিত হলে পরিবারগুলো কন্যাদের তুলনায় পুত্রসন্তানদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে অনেক প্রতিভাবান কন্যাশিশু তাদের শিক্ষাগত সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত করতে পারে না।
নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সবচেয়ে গুরুতর সামাজিক সমস্যাগুলোর একটি। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড হামলা এবং মানবপাচার এখনও নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য হুমকি হয়ে আছে। সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক চাপ বা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাবের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করেন। নারীদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষার জন্য আইন প্রণীত হলেও কার্যকর প্রয়োগ, সময়মতো তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা সেবা এখনও অব্যাহত চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা মোকাবিলায় আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
প্রচলিত অর্থনৈতিক বৈষম্যও নারীদের উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। নারীরা কৃষি, উৎপাদন ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, একই ধরনের কাজের জন্য তারা প্রায়ই পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান। অনেক নারী কম বেতনের এমন কাজে নিয়োজিত থাকেন যেখানে চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সুবিধা খুবই কম। জমির মালিকানা, আর্থিক সেবা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগে প্রবেশাধিকার এখনও অসম। পোশাকশিল্প লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং ন্যায্য মজুরি সম্পর্কিত উদ্বেগের এখনও সমাধান প্রয়োজন।
নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবাও অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হলেও গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের সম্প্রদায়ের অনেক নারী এখনও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পেতে সমস্যার মুখোমুখি হন। সীমিত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর ঘাটতি, পরিবহনসংক্রান্ত বাধা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা মাতৃ ও প্রজননস্বাস্থ্যের ফলাফলকে প্রভাবিত করে। কিশোরীরা প্রায়ই প্রজননস্বাস্থ্য ও মাসিক পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। মাসিক ও প্রজননস্বাস্থ্যকে ঘিরে সামাজিক ট্যাবু ভুল তথ্য, লজ্জা এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত খারাপ চর্চার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
প্রতিবন্ধী নারী ও কন্যাশিশুরা লিঙ্গবৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত বাধার মুখোমুখি হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও সরকারি সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। সামাজিক পক্ষপাত ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রায়ই তাদের সমাজে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণে বাধা দেয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি, সহজপ্রাপ্য সুবিধা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সচেতনতা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে।
ডিজিটাল বৈষম্য আরেকটি উদীয়মান সমস্যা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, অনেক কন্যাশিশুর এখনও ছেলেদের তুলনায় ডিজিটাল ডিভাইস, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতায় কম প্রবেশাধিকার রয়েছে। অনলাইন হয়রানি ও সাইবারবুলিং কন্যাশিশুদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে আরও নিরুৎসাহিত করে। ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং আরও নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরি করা এই বৈষম্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।
লিঙ্গসমতা অর্জনের জন্য সরকার, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আইন শক্তিশালী করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরি করা, সমান মজুরি নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ করা এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য পদক্ষেপ।
নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে সম্মান করে এবং পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে যৌথ দায়িত্ব পালনের প্রচার করে লিঙ্গসমতা সমর্থনে পুরুষ ও ছেলেদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা করা শুধু ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের বিষয় নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও।
নারী ও কন্যাশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সব নাগরিকের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
তাই উপরোক্ত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকলের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হওয়া উচিত বলে আামি মনে করি।
[লেখক পরিচিতি : সৈয়দা রাশিদা বারী-লেখক, কবি ও সাংবাদিক।]



