বাংলাদেশের জন্ম কোনো আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল এক অমর রক্তিম অগ্নিপরীক্ষা ও দীর্ঘ ত্যাগের সুকঠিন ফসল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগ আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসের মহাকাব্য আজও আমাদের শিরায় শিরায়, প্রদীপ্ত চেতনায় প্রবহমান। একাত্তরের চেতনা কেবল ধুলোবালি জমা কোনো ইতিহাস নয়—এটি আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল দ্বীপশিখা, সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি এবং অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীলতার চিরন্তন প্রেরণা।
নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঝড়, সহিংসতা ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের চরম অস্থিরতার মধ্যেও এই অবিনাশী চেতনা বাঙালির সামষ্টিক মনস্তত্ত্বে নতুন করে জেগে উঠছে। শহীদের রক্তের ঋণ যেন আজ নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে আবারও এক বজ্রকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দিচ্ছে।
নিকট অতীতে দেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তন, নানামুখী বিতর্ক এবং সুপরিকল্পিত আন্দোলনের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা হরণ ও জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যে নেতিবাচক ও প্রতিহিংসামূলক তৎপরতা চালানো হচ্ছে, তা একটি গভীর সত্যকে উন্মোচিত করেছে। তা হলো—বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজও একাত্তরকেই তাদের জাতীয় অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ মনে করে।
জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে আঘাত, ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভাঙচুর, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর নানামুখী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো একাত্তরের চেতনাকে অবদমিত করতে পারেনি; বরং মানুষের ক্ষোভকে আরও পুঞ্জীভূত করে তা শক্তিশালীভাবে জাগিয়ে তুলেছে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল দাবার ছকে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ও হেনরি কিসিঞ্জারের কূটনীতি পাকিস্তানের বর্বর সামরিক জান্তাকে প্রত্যক্ষ অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সমর্থন করেছিল। এমনকি বাঙালির নিশ্চিত বিজয় রুখতে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছিল মার্কিন সপ্তম নৌবহর (Seventh Fleet)। বিপরীতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে. ব্লাড তাঁর বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ ওয়াশিংটনের এই নীতিকে ‘নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ আখ্যা দিয়ে গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ক্ষত ও ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের তিক্ত অভিজ্ঞতা আজও প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালির মনে গভীর প্রশ্ন ও শঙ্কা জাগিয়ে রাখে।
চলতি ঘটনাপ্রবাহে সেই পুরনো বেদনাদায়ক সত্য ও পাক-মার্কিন অক্ষের অতি-তৎপরতা আবারও ভিন্ন আঙ্গিকে সামনে এসেছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও diplomatic (কূটনৈতিক) পদক্ষেপগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ সুগভীর এক আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বেড়াজালে বন্দি। দেশটিকে সুকৌশলে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পাকিস্তানিকরণের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে, যেখানে মার্কিন ও পাকিস্তানি অক্ষের এক অশুভ ছায়া আমাদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের আড়ালে যে সুপরিকল্পিত ছক আঁকা হয়েছিল, তার আসল উদ্দেশ্য কেবল একটি নির্বাচিত সরকার পরিবর্তন ছিল না। কোটা ইস্যুকে ঢাল বানিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের মূল নীলনকশা ছিল এই স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানা। এটি ছিল মূলত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমূলে বিনাশ করে বাংলাদেশকে পুনরায় ১৯৭১-পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ভাবধারায় এবং একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। বঙ্গোপসাগরে নিজেদের একাধিপত্য বিস্তার ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার চারণভূমি হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করাই ছিল এই চক্রের নেপথ্য পরিকল্পনা।
বাস্তবতা হলো, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরেরও বেশি সময়কালের রাষ্ট্রীয় নীতি ও সিদ্ধান্তসমূহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা কীভাবে সুকৌশলে পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গিয়েছেন। পাকিস্তানের সাথে কয়েক দশকের কূটনৈতিক শীতলতা ভেঙে ড. ইউনূসের প্রশাসন প্রায় একতরফাভাবে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করেছে। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে পাকিস্তানের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং করাচি থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের নৌ-রুট চালু করে পাকিস্তানি পণ্যবাহী জাহাজকে বাংলাদেশে নোঙরের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের সাথে দহরম-মহরম বাড়িয়ে ২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের মাটিতে অনুষ্ঠিত ‘আমান-২৫’ (AMAN25) যৌথ সামুদ্রিক সামরিক মহড়ায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
অন্যপক্ষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে ড. ইউনূস সরকার ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে অত্যন্ত বিতর্কিত ‘ইউএস-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (Reciprocal Trade Agreement) বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আড়ালে বাংলাদেশের বিশাল ডিজিটাল ডেটা সীমানা মার্কিন টেক জায়ান্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এবং মার্কিন মোটরগাড়ি, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও দেশীয় শিল্পকে পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল।
গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে এই আধিপত্যবাদের আরও একটি নগ্ন রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তো কদিন আগে—২০২৬ সালের ৪ জুলাই—যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম independence day (স্বাধীনতা দিবস) কে কেন্দ্র করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে এক আরম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে দেশের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে খোদ বাংলাদেশের মাটিতে মার্কিন আধিপত্যের এই প্রকাশ্য উৎসব ও উদযাপন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কলাম ও টকশোতে এই আয়োজনকে কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে, বরং বাংলাদেশে ওয়াশিংটনের নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং নব্য ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারের প্রতীকী মহড়া হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৭১ সালে যে শক্তি আমাদের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল, আজ সেই শক্তির উৎসবের আলোয় বাংলাদেশের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের অতি-উচ্ছ্বাস দেশের সার্বভৌমত্বকামী সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে মর্মাহত ও সংক্ষুব্ধ করেছে। এই বিষয়টি বাঙালি জাতিকে আজ এক নতুন জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দেয়ালপিঠ ঠেকে যাওয়া বার্তা দিচ্ছে।
মার্কিন ও পাকিস্তানি স্বার্থের অনুকূলে নেওয়া এসব আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশকে নিজস্ব স্বকীয়তাচ্যুত করে বহিরাগত শক্তির আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত করার এক গভীর চক্রান্ত সফল করা হয়েছে, যা জাতির অস্তিত্বকে চরম সংকটের মুখে ফেলেছে। বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তার অভ্যন্তরে জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বর্তমান কর্মকাণ্ড এই নেতিবাচক প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দল বা ব্যক্তির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ এবং গৌরবময় যৌথ অর্জন। তাই শহীদদের সম্মান রক্ষা, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা অটুট রাখা এবং স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পর থেকে আজ অবধি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সুকৌশলে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে, যার ফলে দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা ও তাঁদের পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকের সংস্কারের নামে সুকৌশলে জাতীয় গৌরবের ইতিহাসকে মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চলছে, তাও এই চক্রান্তের একটি অংশ।
তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাঙালিকে জোর করে দমানো যায় না। এই তীব্র সংকটই যেন একাত্তরের চেতনাকে আরও বেশি অবিনাশী ও শক্তিশালী করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে অবরুদ্ধ সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সবখানেই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার অবিনাশী গানগুলো আজ নতুন উদ্দীপনায়, নতুন বিদ্রোহে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইতিহাসকে আড়াল করার বা মুছে ফেলার রাষ্ট্রীয় চেষ্টা যত বাড়ছে, মানুষের হৃদয়ে একাত্তরের আলো ততই প্রখর ও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
এই ঘন অন্ধকারের মাঝেও আজ এক নতুন আশার আলো উদ্ভাসিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অরাজকতা, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, তীব্র মূল্যস্ফীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে সাধারণ মানুষ আজ ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে এবং দেশরত্ন শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রতিটি মুহূর্তে উপলব্ধি করছে। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মূল চালিকাশক্তি করে বাংলাদেশ উন্নয়নের যে অভূতপূর্ব মহাকাব্য রচনা করেছিল—তা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা অবকাঠামো, মজবুত অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনন্য মর্যাদায় আজ বিশ্বস্বীকৃত।
আজ কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে এই বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, উগ্রবাদের উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার কোনো বিকল্প নেই। তাঁকে পুনরায় দেশমাতৃকার হাল ধরার সুযোগ করে দিয়ে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং উন্নয়নের থমকে যাওয়া চাকা সচল করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে একাত্তরের চেতনাই আমাদের একমাত্র ধ্রুবতারা। এটি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জাতীয় আত্মমর্যাদার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। এই চেতনাকে ধারণ করেই আমরা একটি সার্বভৌম ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ টিকিয়ে রাখতে পারি। একাত্তর ফিরে আসুক—পাক-মার্কিন অক্ষের সকল নব্য উপনিবেশবাদী ও ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতির নতুন ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ গড়ে উঠুক। এটাই আজ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার কোটি বাঙালির বুকফাটা আর্তনাদ ও গভীরতম প্রত্যাশা।
🖋️ লেখক পরিচিতি
কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু সমকালীন বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র, সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।



