ময়মনসিংহ ফুলপুর উপজেলার আমুয়া কান্দা এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মালিকানাধীন সিএন্ডবি পুকুর ভরাট করে প্রায় ৫০টি দোকান নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুমোদন ছাড়াই সরকারি জমিতে এ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) দুপুরে দেখা যায়, সড়কের পাশে পূর্বে যারা অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করতেন, তাদেরকেই স্থায়ী দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে দোকানপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত সিকিউরিটি মানি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এই অর্থ আদায় করার জোর চেষ্টা চলছে।

জানা গেছে, ফুলপুর পৌরসভা থেকে খড়িয়া নদীতে ড্রেজার স্থাপন করে ওই পুকুরে বালি ফেলে ভরাট করা হয়। পরবর্তীতে এখানে সিএনজি ও বাস স্ট্যান্ড করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সাদিয়া ইসলাম সীমার নির্দেশ অনুযায়ী এ নির্মাণ কাজ চলছে। তিনি সওজ এর জমি দখলে নিয়ে পৌরসভা কর্তৃক নির্মাণ কাজ করছেন কিভাবে এই প্রশ্নের উত্তর একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।
তবে ফুলপুর উপজেলা সহকারী (ভূমি) কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, সরকারি জমি সরকারি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। খবর নিয়ে দেখেছি প্রায় ৩৭জন দোকানদার এর নাম আমাদের কাছে এসেছে। যেই টাকা খরচ হচ্ছে দোকান নির্মাণে ওই পরিমাণ টাকা দিয়ে এবং মাসিক একটি ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হবে,যা পৌরসভা থেকে নেওয়া হবে।
এছাড়াও তিনি বলেন, আমি আসার পূর্বে কাজ শুরু হয়েছে,আমি সবধরনের অনিয়ম দুর্নীতি মোকাবেলা করার জন্য চেষ্টা করবো।
ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, বাস্তবে পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবেই সরকারি জমিতে পুকুর ভরাট করে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর অনুসারীরা নিয়মিত নির্মাণ কাজ পরিদর্শন ও তদারকি করছেন। একইসঙ্গে শ্রমিকদের কাজ শেষে পাওনা টাকা পরিশোধ করতেও দেখা যায় তাঁকে। বিকেলে পৌর প্রশাসকের গাড়ি থেকে পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের হাতে টাকা দিতে দেখা যায়। এ সময় পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিএনপি নেতার ঘনিষ্ঠতা স্থানীয়দের নজরে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই সরকারি জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা একদিকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি, অন্যদিকে সরকারি সম্পদ দখলের শামিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার সাদ্দাম সাংবাদিকদের বলেন,
“সওজের জমি দখলের কোনো সুযোগ নেই। পৌরসভার ইউএনও মৌখিকভাবে আমাদের জানিয়েছিলেন এখানে বাসস্ট্যান্ড করা হবে। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা কোনো লিখিত অনুমতি দেইনি এবং কোনো চিঠিও পাইনি। দোকান নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো, ইনশাআল্লাহ।”
দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করা কয়েকজন দোকানদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে রাস্তায় অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছি। এখন বলা হচ্ছে দোকান পেতে হলে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। এটা আমাদের জন্য বড় চাপ। সরকারি জায়গায় দোকান দিতে হলে টাকা কেন দিতে হবে—এ প্রশ্নের কোনো জবাব পাচ্ছি না।”
স্থানীয় বাসিন্দা আহসান কবীর রুবেল সাংবাদিকদের বলেন, “বাসস্ট্যান্ডের নাম করে এখানে যে দোকান নির্মাণ হচ্ছে, সেটা পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। পুকুর ভরাট করে সরকারি জমি দখল করা হচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব। এতে পরিবেশ যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
আরেক স্থানীয় গোলাম সারওয়ার বলেন,
“সরকারি জমি এভাবে দখল করে দোকান নির্মাণ হলে ভবিষ্যতে এখানকার জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব কাজ করা হলে সাধারণ মানুষের আর কিছু বলার থাকে না।”
জমির সাবেক মালিক পরিবারের সদস্য রফিকুল ইসলাম রয়েল বলেন,
“এই জমিগুলো আমাদের পরিবারের ছিল। সওজ আমাদের কাছ থেকে আইনগতভাবে জমি অধিগ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে আমরা নিয়ম মেনে জমিটি লিজ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু পৌরসভার দোহাই দিয়ে একটি কুচক্রী মহল সরকারি জমি দখলে নিয়ে বাণিজ্য করার পাঁয়তারা করছে। এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক ও বেআইনি।”
এসব বিষয়ে উপজেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, পৌরসভা থেকে কাজ করা হচ্ছে, আমি ব্যবসা করি গোলাম মোস্তফার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি তবে এটি অন্য টাকা। কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপার তিনি অস্বীকার করেন, এখানে তার বাড়ি সেজন্য তিনি এখানে আড্ডা দেন বলে দাবি করেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা অবিলম্বে অবৈধ নির্মাণ কাজ বন্ধ, সরকারি জমি উদ্ধার এবং দোকান বরাদ্দের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।




