হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চল বর্তমানে পানির নিচে। কৃষকের তিন মাসের কষ্টে উৎপাদিত সোনালী ধান তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডুবে থাকা পাকা ধানের আশা ছেড়েই দিয়েছেন কৃষকরা। শুকানোর জায়গা ও সুবিধাজনক আবহাওয়া না থাকায় ঘরে তোলা বেশির ভাগ ধানও নষ্ট হয়ে পচে যাচ্ছে। যে সময়টায় সোনালি ধানের ঘ্রাণে ভেসে থাকার কথা, সে সময়ে হাওর জুড়ে হতাশা আর পচা ধানের গন্ধ। হাওর জুড়ে কোলাহল ও প্রাণচাঞ্চল্যের বদলে চাপা কান্না ও আহাজারি ছড়িয়ে আছে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার উল্লেখযোগ্য ২৩ ভাগ হাওর অঞ্চল থেকে উৎপাদিত হয়। অন্যান্য এলাকা এবং হাওরের কৃষি উৎপাদনের মধ্যে সময় ও বাস্তবতায় নানা ফারাক আছে। যে বছর হাওর অঞ্চলের বোরো ধানের ফলন কৃষক নির্বিঘেœ ঘরে তুলতে পারেন, সে বছর চালের দাম ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, নিশ্চিত হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। অন্যথায় চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরী হতে বাধ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এবার পাহাড়ি ঢলে ফসলের বেশি ক্ষতি হয়নি, বরং টানা বৃষ্টির পানি বাঁধের কারণে নদীতে নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন দেশে দেশে স্পষ্ট। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি প্রতিবছরই দেখা যাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতিও অনেক। কিন্তু অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে, ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের সরকার এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। অনেক সময় শুধুমাত্র সরকারের লোকজনের লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরী করতে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন প্রকল্প গ্রহণ করছে রাষ্ট্র, যাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। হাওর অঞ্চলে প্রতি তিন বছরে একবার আকস্মিক বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়া একটি পুরনো ও নিয়মিত ঘটনা। এবারের ঢলে পানির তোড়ে এবং অসময়ের বৃষ্টিতে ধান কাটার আগেই তা তলিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেছেন, হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক সাড়া। আমরা মনে করি, এর যথাযথ বাস্তবায়ন হতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হাওরে ফসল রক্ষায় টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। সবচাইতে কঠিন কাজ হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মানুষের মতো করে তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া।দ্বিতীয় কঠিন কাজ হবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করা। জমির মালিকদের একটা হিসাব থাকলেও প্রকৃত চাষিদের কোনো তালিকা সরকারের কারো কাছে আছে বলে মনে হয় না। ফলে জমির মালিক ক্ষতিপূরণ পেলেও সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক এর থেকে বঞ্চিতই রয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, এসব বন্যায় জমির মালিকদের কোনো ক্ষতি হয় না। তাঁরা আগাম টাকা নিয়ে চাষিকে দেন চাষ করতে। চাষি ধারকর্জ করে ফসল ফলান। তিন মাসের সহায়তা হোক আর এককালীন সহায়তা হোক, কোনোটাই ক্ষতিগ্রস্ত চাষির কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় সরকারের কার্যকর অনুপস্থিতিতে এখানে দলবাজদের দৌরাত্ম্য দেখা দিলে সরকারের উদ্যোগ বাঁধাগ্রস্থ হবে। মানুষ আসলে ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা দেখতে চাই। দেখতে চাই, যারা বাঁধ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি করে, তাদের বিচার হোক, যা কেউ কোনো দিন করেনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হাওর অঞ্চল। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল ফলান, তার ওপর নির্ভর করে দেশের চালের একটি বড় অংশ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যে হাওর আমাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দেয়, সেই হাওরই আজ কৃষকদের জন্য পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা ও বেদনার প্রতীকে। এবারের টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। এই সংকট কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। হাওরের নদ-নদী ও খাল-বিলগুলো বছরের পর বছর খননের অভাবে নাব্য হারিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। খোয়াই, সুরমা, কুশিয়ারা, কংশ, ভোগাইসহ প্রায় সব নদীরই একই চিত্র। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যখন এই নদীগুলো দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তা ধারণ করার সক্ষমতা না থাকায় পানি পাড় উপচে হাওরে ঢুকে যায়। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে চলে যায়। এই অবস্থা থেকে হাওরের কৃষককে রক্ষা করতে হবে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সমস্যাগুলো নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। অনেক ক্ষেত্রে অস্থায়ী বা দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা সামান্য চাপেই ভেঙে পড়ে। কোথাও কোথাও প্রকল্প নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বা সমন্বয়হীনতার কারণে কার্যকর ফল দিতে পারেনি। অতিবৃষ্টিতে ও পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও হাওরের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই। একই সাথে পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত হাওর এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখা উচিত। হাওরের ফসল সুরক্ষায় আগে থেকে আলাদা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে সরকারকে। অবিলম্বে হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে আগামী ফসল না আসা পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং আগামী অন্তত ৬ মাস রেশনিংয়ের ব্যবস্থা জারি রাখা প্রয়োজন। একই সাথে কৃষকের কৃষিঋণ-এনজিও-মহাজনী ঋণ আদায় আগামী ছয় মাসের জন্য স্থগিত ও সুদ মওকুফ করতে হবে। হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ ধান চাষিদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ শস্যবিমা চালু করা প্রয়োজন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) দূর্নীতি ও অনিয়মের হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করা, পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিটি গঠন, বাঁধের ছোটখাটো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, স্থানীয় মানুষ যেন নিজেরাই বাঁধ রক্ষা করে সেই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা, বাঁধ দ্রুত মেরামত করা, কৃষকদের মালিকানাবোধ তৈরি করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের প্রত্যাশা বর্তমান সরকার হাওরের কৃষকের কান্না থামাতে স্থায়ী সমাধানের লক্ষে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করবেন।
[ লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক,
E-mail : gmbhuiyan@gmail.com]




