যার সর্বশেষ শিকার প্রখ্যাত সূফী সাধক হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এর মিরপুর মাজারে হামলা। রাজধানীর মিরপুরে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর মাজারে হামলার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের ওপর চলমান চাপের আরেকটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
মাজার, দরবার, খানকা, আখড়া বা সাধকদের স্মৃতিস্থান —এগুলোকে কেবল “কবরপূজা” বা “কুসংস্কার” বলে উড়িয়ে দেয়া বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের আত্মীক জীবনকে অস্বীকার করা ও অপমান করা।
এইসকল স্থানে ইসলাম, স্থানীয় সমাজ, ফকিরী-দরবেশী ধারা, বৈষ্ণব সহজিয়া, নদীয়ার ভাব, পীর-মুরিদি সম্পর্ক, আখড়া ও জনজীবনের বহু স্তর এসে মিশে গেছে। সুতরাং মাজার-বিরোধী ঘৃণামূলক ভাষা আসলে শুধু একটি ধর্মীয় মতের বিরোধিতাই নয়, এটা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক ইতিহাসের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক আক্রমণ।
আমাদের দেশে ছোট-বড় অনেক মাজার রয়েছে। সব মাজারেই আগত লোকজনের মধ্যে একটা বিশ্বাস কাজ করে। কারো মধ্যে সেই বিশ্বাস নাও থাকতে পারে। যার বিশ্বাস নাই সে যাবে না। কিন্তু যাঁদের আছে, তাঁদের কেউ বাধা দেবেন কোন যুক্তিতে? অথচ সেই কাজটাই প্রায় দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে।
সেটা হয়ে উঠে এক ধরনের ফ্যাসীবাদী আচরন, সেটা ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের কাজ কোনো বিশেষ মাজহাব, তরিকা বা ধর্মীয় মতকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া না। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের জান-মাল, ইবাদত, স্মৃতি, কবরস্থান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষা করা। প্রশাসন যদি মাজারবিরোধী শক্তির সঙ্গে আপস করে, চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা তাদের ভাষা ধার নেয়, তাহলে অবশ্যই বলা যাকে সে আইনের শাসন প্রতিষ্টার পেছনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। একই সাথে ধর্মীয় সন্ত্রাসের দিকে দেশ ও সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাজারে যারা যান তারা একটি বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে যান। কিছু ধান্দাবাজ যে যান না, তা নয়। সে রকম ধান্দাবাজেরা তো মসজিদেও যান, মাদ্রসায়ও দান করেন। কিন্তু মূলত যাঁরা মাজারে যান, তাঁরা একটা প্রবল বিশ্বাস নিয়েই যান। তাঁদের চোখমুখে সে বিশ্বাস পড়া যায়।
নিরুদ্বিগ্ন সরকার সেটাও চেয়ে চেয়ে দেখল, কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিল না। গত ১২ ফেব্রুয়ারী দেশে নির্বাচন হলো। একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলো। তাহলে এখন কেন মীরপুরে শাহ আলী (রহ.)এর মাজারে হামলা হয় ? এখন প্রশ্ন, এই যে গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মাজারের ওপর হামলা, এটা কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ কি ?
রাজধানীর মীরপুরে ঐহিত্যবাহী হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এর মাজারে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক মাজারে ঢুকে জিয়ারতকারীদের মারধর করে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয়রা এবং পুলিশের একাধিক বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে অসামঞ্জস্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট : আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের আগেই রাজনৈতিক দোষারোপ চলছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ হামলায় জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন; পুলিশও ‘তাদের কিছু লোক থাকতে পারে’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযান কোনোভাবেই লাঠিসোঁটা হাতে দলবদ্ধ হামলা, মারধর কিংবা ধর্মীয় স্থানে ভাঙচুরকে বৈধতা দেয় না। বাংলাদেশে বহু মাজার, দরগাহ ও খানকাহ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এগুলো লোকঐতিহ্য, সুফি সংস্কৃতি এবং সামাজিক সহাবস্থানের অংশ। একটি স্থানে অপরাধের অভিযোগ থাকলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে, কিন্তু পুরো প্রতিষ্ঠান বা অনুসারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো সভ্য রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না।
একটি বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ভোটের আগে সবাই মাজারে যায়, কিন্তু মাজারে হামলা হলে কেউ সহমর্মিতা দেখাতে আসে না। সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ও মাজার ভক্তদের ওপর হামলা প্রকৃত পক্ষে বিরুদ্ধ মতের ওপর হামলা।মাজার ভাঙা, মাজারে হামলা, ওরস বন্ধ করা, দরবারে ভয় দেখানো, পীর-মুরিদদের অপমান করা, অথবা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ঘৃণা ছড়ানো—এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।
সেটিও হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হবে আইনগত প্রক্রিয়ায়, হামলা বা ভাঙচুরের মাধ্যমে নয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও সুফি দরগায় হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ফলে হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) মাজারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নাই। এ ধরনের হামলা যদি ধারাবাহিকভাবে ঘটে, তাহলে তা সামাজিক অস্থিরতা ও বিভাজনকে উসকে দিতে পারে। মত ও বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে সেই ভিন্নতার প্রকাশ সহিংসতার মাধ্যমে হলে তা রাষ্ট্র ও সমাজ কারও জন্যই শুভ নয়।
মাজারে হামালার ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে সরকারকে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে, সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদেরকে সহিংসতা, উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। নীরবতা বা অস্পষ্ট অবস্থান গ্রহন করে সমাজে ভুল বার্তা দেয়া সঠিক হবে না।
রাষ্ট্র যদি সময়মতো স্পষ্ট বার্তা না দেয়, তাহলে আজ মাজার, কাল অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিসর একই ধরনের হামলার শিকার হবে। আইনহীন জনআক্রোশ কখনো নৈতিক সমাজ গড়ে না; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে ক্ষয় করে। শাহ আলী মাজারের ঘটনা তাই কেবল একটি রাতের সহিংসতা নয়, এটি সরকারের জন্য আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে হলে ধর্মের প্রশ্নে মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেয়া যাবে না। মাজারের ওপর হামলা শুধু ইট-পাথরের ওপর হামলা না; এটা জনগণের স্মৃতি, বিশ্বাস, ভক্তি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মিলনের ওপর হামলা। এই হামলা প্রতিরোধে সকলকে এক সাথে কাজ করতে হবে।
[লেখক : কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]E-mail : gmbhuiyan@gmail.com




